প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে নেতাজির মাটিতে নেতাজি অপমানিত!

সম্পাদকীয়
Spread the love

নজর বাংলা সম্পাদকীয় ডেস্ক: সাম্প্রদায়িক শক্তির দালাল ব্যক্তি যদি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন, তাহলে তার দ্বারা কখনোই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ কে সঙ্গে নিয়ে চলা সম্ভব নয়!

বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্ম দিবসে কেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে নেতাজিকে অপমান করছে, আর আমরা যারা সর্বদা নেতাজির রাজ্যের মানুষ হিসেবে গর্ববোধ করি সেই বাঙালি নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছি !

ছিঃ ছিঃ ছিঃ

প্রধানমন্ত্রীর পরোক্ষভাবে সাহস জোগানোর ফলে যে সমস্ত ব্যক্তিরা আজ শুধুমাত্র নেতাজি নন স্বয়ং ভগবান শ্রী রামচন্দ্র কে অপমান করলেন তাদের জন্য সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি তাদের যেন দ্রুত শুভবুদ্ধির উদয় হয়।

আজ মমতা ব্যানার্জি তৎক্ষণাৎ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার সেই সিদ্ধান্ত কে সমর্থন জানাচ্ছি। তবে আর একটু অন্য ভাবেও প্রতিবাদ টি জানানো যেত। যাই হোক দিনের শেষে মমতা ব্যানার্জি কে ধন্যবাদ। কেননা পরাধীন জন্মভূমি ও দুর্ভাগ্যপীড়িত দেশবাসীদের সম্পর্কে আজীবন যিনি ভেবেছেন, যে ব্যক্তি দেশবাসীর মুক্তির জন্য স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন সার্থক করে তুলতে নিজের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও চলে গেছেন দেশান্তরে রণাঙ্গনে। হতাশা ও ব্যর্থতার মধ্যেও তিনি বিশ্বাস করতেন দুর্গম পথের শেষে বিজয়লক্ষ্মী অপেক্ষা করছেন বরমাল্য হাতে। সেই বীরপুরুষ বরেণ্য দেশনায়ক তাঁর মাটিতে যে ভাবে অপমানিত হতে হলো সেটাই সত্যিই খুব দুর্ভাগ্যের এবং দুঃখজনক ঘটনা।

এখন প্রশ্ন হলো – কেন বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনের দিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি আমার দেশ ?

উঃ – আমরা আজ বই এর পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে শিক্ষা নিতে শুরু করেছি। তার সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্ত বিরোধ রাজনৈতিক দলের নেতারা দিন-রাত সর্বদা ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং নেতাজির আদর্শ আদর্শ বলে চিৎকার করেন তাদের মধ্যে ৯৫% (এর থেকেও বেশি হতে পারে) ব্যক্তি নিজেই নিরপেক্ষ নন, বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত।

যাই হোক, এবার একবার দেখে নেওয়া যাক প্রকৃত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কে ? তিনি কি চাইতেন ?

প্রথমতঃ আমার মতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শুধুমাত্র একজন রক্তে-মাংসে গড়া ব্যক্তি নন, তিনি হলেন একটি শক্তি/আদর্শের নাম। যে শক্তির সাহায্যে ভেদভাবহীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখা সম্ভব—যে শক্তির সহযোগিতায় এমন এক দেশ গঠন করা সম্ভব যে দেশে সকলের সমানাধিকার থাকবে, থাকবে ধনী-দরিদ্র জাত-ধর্ম ভাষা ইত্যাদির ভেদাভেদ ভুলে সকলের প্রতি সকলের মর্যাদাবোধ। যে আদর্শ আমাদের বাধ্য করবে কোন ব্যক্তির সমস্যা হলে সেই ব্যক্তিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ যে স্বাধীনতা পেয়েছিল সেটা নেতাজির ভাষায় “রাজনৈতিক স্বাধীনতা”। তিনি বলেছেন , শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই পূর্ণ স্বাধীনতা নয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে তখন তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা বলা যাবে। আজ রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাত দশক পর আমার কোথায় দাঁড়িয়ে আছি ? সেটা সমাজের শুভোবুদ্ধি সম্পূর্ণ নাগরিক/ভোটাররা হয়তো বুঝতে পারছেন!

১৮৯৭ সালের ২৩ শে জানুয়ারি সুভাষ চন্দ্রের জন্ম। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীর গোঁড়াই ভারতবর্ষের সংস্কৃতিক ও বৈদ্ধিক জগতের আলোড়ন এর প্রভাব তার উপর পড়েছিল। আবার ভারতবর্ষের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে একান্ত হয়েই তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন।

স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় বিবেকানন্দের আদর্শে বিশ্বাসী সুভাষচন্দ্র কে আমরা দেখি মানবতাবাদী পরিব্রাজক ও সমাজ সংস্কারক রূপে। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে তার উত্তরণ ঘটলো। ১৯১২-১৩ সালে মাকে লেখা চিঠি গুলির মধ্যে আমরা দেখি সুভাষচন্দ্রের দেশপ্রেম এর মধ্যে আধ্যাত্মবাদের স্পর্শ রয়েছে, দেশ ভক্তি কে তিনি মাতৃ পূজা পর্যায় নিয়ে গিয়েছেন। দেশের এবং ধর্মের বর্তমান অবস্থা দেখে তিনি বিচলিত আজকাল যেখানে ধর্মের নাম, সেখানেই যত ভন্ডামি এবং যত অধর্ম। সুভাষচন্দ্র মাকে জিজ্ঞাসা করছেন আমাদের দেশের অবস্থা কি দিন দিন এইরূপ অধঃপতিত হইতে থাকিবে , দুঃখিনী ভারতমাতার কোন সন্তান কি নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মায়ের জন্য জীবনটা উৎসর্গ করবে না ?

ইতমদ্ অর্থাৎ বিশ্বাস, ইত্তেফাক অর্থাৎ ঐক্য, কুরবানী অর্থাৎ ত্যাগ। এই তিনটি শব্দকে সামনে রেখেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেশ মায়ের মুক্তির জন্য সংগ্রামের পথ চলা শুরু।

স্বাধীনতা সংগ্রামে তারকাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম তারকা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বিষয়ে তার গভীর আগ্রহের বিষয়টি ভুলে গিয়ে অনেক বন্ধুরা গেয়েছে তার সামরিক বীরত্বগাথা।

অনেকেই পরাধীন ভারতবর্ষে এই বীর মহাপুরুষের সমালোচনা করেছেন বারংবার, কিন্তু কখনো দেশপ্রেমের পথকে ভোলাতে পারেননি। তাইতো তিনি আজও আমাদের হৃদয়ের একটি কোণে জায়গা করে নিয়েছেন।

এক তীক্ষ্ণণ দৃষ্টি বক্তা একবার বলেছিলেন “স্ট্যাচু হোক আর ছবি হোক যতবার তাকে দেখি কি যেন এক অপূর্ণ তৃষ্ণা জেগে ওঠে । কি যেন এক অধরা প্রতিশ্রুতি মনে পড়ে যায় , কি একটা আশার আলো মনের মধ্যে ঝলসে ওঠে , তবে কি না , বেশিরভাগ আশার আলোর পাশেই যে ছায়া ছায়া ভাব, সেই ছায়া কিন্তু এই আলোটিতে লেগে থাকে না। নেতাজি যেন “জাতির ক্ষমতা -তন্ত্রের মূর্ত বিকল্প। যেখানেই ন্যায়ের স্খলন, যেখানেই স্বাধীনতার সংকট —সেখানেই দেখা যায় তার আহবান । তার জীবনের আশ্চর্য সব অভিযান তাকে দেশের সীমানার বহু দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল । সেই বিশ্বমঞ্চে সত্যিকারের তারকা হয়ে উঠেছিলেন তিনি, কত নাটকীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন , কত বাধা বিপদ পেরিয়েছেন। তাঁর বিরাট ভাবনা জগতের পরিসর জুড়ে থাকতো যে সাম্রাজ্যবাদহীন পৃথিবীর স্বপ্ন, উপনিবেশিক শাসনের অবমাননা ও অত্যাচারের শৃংখল থেকে মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ইতিহাসে তার স্থান নির্ধারিত হওয়া উচিত।

“এই নশ্বর দুনিয়ায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়, সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে,” ১৯৪০ সালে লেখেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বেঁচে থাকে কেবল ভাবনা আদর্শ এবং স্বপ্ন। আমরণ অনশনের জন্য তৈরি হতে হতে তার প্রত্যয় হয় —যে ধারণার জন্য কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত থাকে, সহস্ত্র জীবনের মধ্যে দিয়ে সেই ধারণার বারংবার পুর্নজন্ম হয়। তার বিশ্বাস এই ভাবেই ক্রমবিবর্তনের চাকা ঘোরে, এই ভাবে ভাবনা আদর্শ ও স্বপ্ন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হয়ে চলে। এই জগতে ত্যাগ ও ক্লেশস্বীকার ছাড়া কোনো আদর্শ পূর্ণতা পায়নি, দৃঢ় উচ্চারণ তাঁর ।এই সেই ত্যাগ —রামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দ যে ত্যাগের কথা বলে গিয়েছিলেন, আই এন এ স্মারকস্তম্ভে যে কুরবানীর কথা খোদিত ছিল। এই ত্যাগই তাকে মৃত্যুহীন প্রাণে পরিণত করে দেয়।

তাইতো ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৭ — যে দিন তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল নেতাজীর কৃতিত্ব বিষয়ে গান্ধীজী বলেছিলেন:

দেশের জন্য নিজের অসাধারণ ক্যারিয়ারের মায়া ত্যাগ করেছিলেন তিনি। বহুবার বন্দিত্ব বরণ করেছেন, দুবার কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, অসম্ভব দক্ষতায় বাংলার সরকারের কড়া পাহারার চোখ এড়িয়ে পালিয়েছেন, প্রবল সাহস ও অসামান্য সংযোগ ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে কাবুল পৌঁছে গিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশ গুলি পেরিয়েছেন , শেষে জাপানে উপস্থিত হয়েছেন, নানা স্থানে ছড়ানো-ছিটানো নানা সম্প্রদায়ের, দেশের নানা অঞ্চলের অসাধারণ তরুণদের সংগ্রহ করে নিজের বাহিনী তৈরি করেছেন , এবং শক্তিমান সরকারের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। যে সব ভয়ানক বিপদ পেরিয়েছেন তিনি , কোন সামান্য মানুষ তাতে সহজেই পরাভূত হয়ে পড়তেন— তিনি কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে তুলসীদাসের কথাই প্রমাণ করলেন , “ভাগ্য সাহসীরই সহায়।

আজকের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সুভাষচন্দ্র বসুর উপরোক্ত কথা গুলি খুবই মূল্যবান । কেননা আজ সমাজের কাউকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হবে না , শুধুমাত্র দেশের স্বার্থে সমাজের স্বার্থে সততার সঙ্গে পথ চলতে পারলেই হয়ত সুভাষচন্দ্র বসুর স্বপ্ন সার্থক হবে। কিন্তু আমরা ব্যর্থ সততা নিয়ে এগিয়ে যেতে, আমরা কি পেরেছি সুভাষচন্দ্র বসুর সেই স্বপ্নকে সফল করতে ? আমার প্রশ্ন রইলো এই পবিত্র দিনে সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষী সমাজ প্রেমী মানুষের কাছে।

কলমে- সিদ্দিক আলী ( অধ্যাপক, জাকির হোসেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *